নুহাশপল্লীতে সারাবেলা

%e2%80%8da

বাংলা দর্পণ: নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের নিবিড় মমতায় গড়ে তোলা নন্দনকানন নূহাশপল্লী। গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামের এই বাগান বাড়িতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাসাহিত্যের জনপ্রিয় এই লেখক।

হুমায়ূন আহমেদ তার বহু জনপ্রিয় উপন্যাস নুহাশপল্লীতে বসেই লিখেছেন। পাশাপাশি তার বহু টিভিনাটক আর চলচ্চিত্রের বেশির ভাগ শুটিং এখানেই করেছেন। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী নূহাশপল্লী দেখতে আসেন। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে একটা দিন কাটানোর জন্য এ জায়গাটি নিঃসেন্দেহে চমৎকার।

b

১৯৮৭ সালে গাজীপুরের হোতাপাড়ার পার্শ্ববর্তী পিরুজালী গ্রামের ৩৭ একর জমিতে নূহাশপল্লী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন হুমায়ূন আহমেদ। একেবারেই অজপাড়াগাঁয়ে শালবনের ভেতরের এই জায়গাটিতে মিশে আছে হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য স্মৃতি।

পিরুজালী গ্রামের বেশিরভাগ পথই ঘন শালবনে আচ্ছাদিত। আলো আধারিতে ঢেকে থাকা এমনই একটি পথ আপনাকে নিয়ে যাবে গাজীপুর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নুহাশপল্লীতে। আধো গ্রাম আধো শহরের খোঁয়া ওঠা পিচের রাস্তা থেকে একটি কাঁচাপথ চলে গেছে নূহাশপল্লীর সদর দরোজায়।

cনুহাশপল্লীর প্রধান ফটকটি খুলে দিলে সবার আগে চোখে পড়বে সবুজে সবুজ বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত একেকটা গাছ। হুমায়ুন আহমেদের ভাষায়, এগুলো ছায়াবীথি। আম, জাম, লিচু, মেহগিনি আর কড়ই গাছগুলো একেকটা অন্যটির চেয়ে বেশ দূরে দূরে। সবুজ মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে রাজহাস, তিতির আর চিনে মুরগির দলে। মাঠের মধ্যেই আছে ছাউনি ঢাকা নামাজঘর ও দাবাঘর। চোখে পড়বে গাছের ডালে বাধা ঘর ‘বৃক্ষগৃহ’।

গান এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে ভালবাসতেন হুমায়ুন আহমেদ।জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর তিনি নুহাশ পল্লীতে হেঁটে বেড়িয়েছিলেন এবং একান্ত কিছু মুহূর্ত প্রকৃতির কাছে থেকে অতিবাহিত করেছিলেন।নুহাশ পল্লীর উত্তর প্রান্তে একটি বড় পুকর রয়েছে যেটির উপর একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরের মাঝে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে একটি তাঁবু টানানো হত। হুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের একটি কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা যায়। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সেই কন্যার নাম দিয়েছিলেন লীলাবতি। এই পুকুরটির নামও রাখা হয়েছে লীলাবতি। হুমায়ুন আহমেদ লীলাবতি নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন।

d

হুমায়ুন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন থাকার সময় এই পুকুরের পাশেই ‘ভুতবিলাস’ নামে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর হুমায়ুন আহমেদ ভুত বিলাসের উদ্বোধন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন মধ্যরাতে ভুতবিলাসের বারান্দায় বসে থাকলে ভুতের দেখা পাওয়া যাবে।

স্থানীয় স্থপতি আসাদুজ্জামান খানের তৈরি করা বেশকিছু ভাস্কর্য রয়েছে নুহাশ পল্লীতে। এখানে প্রবেশের সময় ‘মা ও শিশু’ নামক ভাস্কর্যটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। শিশুদের আনন্দ দিতে এখানে ভুত এবং ব্যাঙের আকারের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া এখানকার ট্রি হাউজটি শিশুদের আনন্দের অন্যতম উৎস।হুমায়ুন আহমেদ ভালবাসতেন বৃষ্টি এবং পূর্ণিমার রাত। বৃষ্টি দেখার জন্য তিনি ‘বৃষ্টি বিলাস’ নামে একটি কক্ষ নির্মাণ করেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ যেন চাঁদের ছায়া দেখতে পারেন এজন্য এখানকার সবুজ উঠান সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হত।

e

নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার বুলবুল নয়জনের একটি দল নিয়ে এখানকার সবকিছু দেখাশোনা করেন।হুমায়ুন আহমেদ যখনই দেশে ও বিদেশে ভ্রমন করতেন তিনি বিভিন্ন রকমের গাছ সংগ্রহ করতেন। নুহাশ পল্লীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলের এবং ঔষধি গাছ রয়েছে। এছাড়া তিনি এখানে খেজুর গাছ এবং চা গাছ লাগিয়েছিলেন যা এখনও আছে।প্রথমদিকে হুমায়ুন আহমেদ নুহাশ পল্লীতে মেহমান নিয়ে আসতেন যারা নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখত। তিনি অতিথিদের বিভিন্ন গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং একটি বিশেষ সুগন্ধিযুক্ত গাছের পাতার স্বাদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাতেন।

বরেণ্য এই লেখকের শোবার ঘরের কাছেই রয়েছে একটি সুইমিংপুল। মাঝে মাঝে প্রিয়জনদের নিয়ে তিনি এখানে সাঁতার কাটতেন। একবার হুমায়ুন আহমেদ ভারতের প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কে নিয়েও সাঁতার কেটেছিলেন।

f

নূহাশপল্লীর বিশাল মাঠের শেষ প্রান্ত থেকে হুমায়ূন আহমেদ নিবিড় পরিচর্যায় গড়ে তুলেছেন একটি ঔষধি গাছের বাগান। বাগানের মধ্যে আছে আকর্ষণীয় জলাধার, যার মধ্যভাগের মৎস্যকন্যার মূর্তিটি দেখা মতো। জলাধারের পাশে পাথরের তৈরি রাক্ষসের কাঠামোটিও বেশ আকর্ষণীয়। বাগানের শেষভাগে আগে কংক্রিটে তৈরি ডাইনোসারের বেশ কিছু মূর্তি। অতিথিদের কাছে ছবি তোলার জন্য জায়গাটা খুব পছন্দের।

নূহাশপল্লীর শেষ প্রান্তে আছে একটি দীঘলদিঘি। খানিকটা লম্বাকৃতি বলে এটাকে ছোট্ট একটা লেক বললেও ভুল হবে না। দীঘির দু প্রান্তে আছে দুটি ঘাট। একটি প্রাচীন আমলের ক্ষয়ে যাওয়া ঘাটের আদলে গড়ে তোলা, অন্যটি আধুনিক। মজার ব্যাপার হলো লেকে মধ্যবর্তী স্থানে ছোট্ট দ্বীপের মতো একটা বসার জায়গা রাখা হয়েছে। যেখানে বসে লেখকের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘আমার আছে জল’ কথা মনে পড়তেই পারে।

g

নূহাশপল্লীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা যেতে চান তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে সেখানে খাওয়া-দাওয়ার জন্য কোনও হোটেল বা রেস্টুরেন্ট নেই। আরো মনে রাখতে হবে, সূর্য ডোবার পর সেখানে বাইরের লোকদের অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয় না।

নুহাশ পল্লীতে মাত্র একদিনের জন্য পিকনিক করার ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য কটেজের ৪ টি কক্ষ বরাদ্দ করা আছে। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস এখানে পিকনিক করা যায়। পিকনিকের জন্য একটি দলে সর্বচ্চ ৩০০ জন থাকতে পারবে। বন্ধের দিনে এখানে পিকনিক করতে ভাড়া দিতে হবে ৬০ হাজার টাকা তবে সপ্তাহের অন্যান্য দিনে এই ভাড়ার পরিমান ৫০ হাজার টাকা।

j

ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের পূর্বপাশের রাস্তা ধরে প্রায় ৮ কিমি যাওয়ার পর নূহাশপল্লীতে পৌঁছানো যাবে। নিজস্ব গাড়ি না থাকলে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, শ্রীপুর, মাওনা বা কাপাসিয়ার যে কোনও বাসে চড়ে হোতাপাড়া নামতে হবে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা। হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা বেবিট্যাক্সিতে করে নূহাশপল্লীতে যাওয়া যায়। রিকশা ভাড়া পড়বে ৮০-১০০টাকা, ট্যাক্সি ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা।